রক্তস্নাত ৫ আগস্ট: আনসার একাডেমির সামনে গুলিবিদ্ধ এক শ্রমিকের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য

২০২৪ সালের গণজাগরণ: ৫ আগস্ট ছাত্র বিদ্রোহের সময় কালিয়াকে আনসার একাডেমি কর্তৃক মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম ছুরিকাঘাতে আহত হন। লিবার্টি নিয়া, যিনি একজন সরল..
By Anwarul – Awareness, Islamic Knowledge and Digital Media

২০২৪ সালের আগস্ট মাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তঝরা অধ্যায়। আমি মো: আনোয়ারুল ইসলাম, পেশায় একজন সাধারণ পোশাক শ্রমিক এবং ওয়েব ডেভেলপার। ৫ আগস্টের সেই উত্তাল দিনে কালিয়াকৈরের আনসার একাডেমির সামনে আমিও ছিলাম ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র সাক্ষী। শরীরে বিদ্ধ সীসার গুলি আর মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার সেই লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা আজ সবার সাথে শেয়ার করছি।

১. ৪ আগস্ট: কারখানার গেট পেরিয়ে রাজপথে

তারিখটি ছিল ৪ আগস্ট, ২০২৪। সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ করেই আমাদের কারখানা, লিবার্টি নিটওয়্যার লিমিটেড (কালিয়াকৈর) ছুটি ঘোষণা করে। গণঅভ্যুত্থানের উত্তাপ তখন সবখানে। নিরাপত্তার স্বার্থে শ্রমিকদের পেছনের গেট দিয়ে বের হতে বলা হয়।

দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে জঞ্জাল আর কোটা আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ওপর পুলিশের নির্মম গুলি আমাকে ঘরে থাকতে দেয়নি। ফেসবুক আর টেলিগ্রামে ‘বাঁশের কেল্লা’ সহ বিভিন্ন গ্রুপে যখন ভাইদের রক্তমাখা ছবি দেখছিলাম, তখন নিজের অজান্তেই মিছিলে পা বাড়াই। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ছাত্রদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্লোগান দিয়েছি। তখন আমাদের একটাই দাবি ছিল—স্বৈরাচারের পতন।

২. ৫ আগস্ট: বিজয়ের সংবাদ ও নতুন শঙ্কা

পরদিন ৫ আগস্ট। ঢাকায় 'লং মার্চ' কর্মসূচি থাকলেও ১৪৪ ধারা আর দমন-পীড়নের কারণে পরিস্থিতি ছিল থমথমে। দুপুরের পর ইন্টারনেট সচল হতেই খবর পেলাম— শেখ হাসিনা পালিয়েছেন। সেনাপ্রধানের ভাষণের পর আমি বাসা থেকে বেরিয়ে সাতটার গেট হয়ে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার দিকে হাঁটা শুরু করি।

কিন্তু বিজয়ের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পল্লী বিদ্যুতের কাছে গিয়ে শুনি আনসার একাডেমিতে গুলির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম, "সেনাপ্রধানের নির্দেশের পরেও কেন গুলি চলছে?" তারা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেন, এবং কিছুক্ষণের জন্য গুলি থামল। কিন্তু সেটা ছিল ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।

৩. আনসার একাডেমি: মূর্তিপূজা ভাঙা বনাম ষড়যন্ত্র

আসরের নামাজের সময় আনসার একাডেমির কাছে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। কিছু আনসার সদস্য এবং উত্তেজিত জনতা শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙছে। কিন্তু আনসারদের মধ্যে কিছু সদস্যের চেহারা ও আচরণ ছিল সন্দেহজনক। স্থানীয় আনসারদের সাথে তাদের মিল ছিল না।

মাগরিবের ঠিক আগ মুহূর্তে পরিস্থিতি ভয়ানক হয়ে ওঠে। আনসার বাহিনীর সদস্যরা হঠাৎ করেই আবার গুলি চালানো শুরু করে। একাডেমির ৩ নম্বর গেট থেকে শুরু হওয়া গুলি ১ নম্বর গেটের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন ১ নম্বর গেটের উত্তরের বাগানে আশ্রয় নিয়েছিলাম।

৪. সেই ভয়ানক মুহূর্ত: আমি গুলিবিদ্ধ হলাম

বাগানের গাছের আড়ালে লুকিয়েও রক্ষা পাইনি। কয়েকজন আনসার সদস্য বাগানে ঢুকে পড়ে এবং এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে থাকে। একজন লাঠি নিয়ে আমাদের দিকে তেড়ে আসছিল। আমি দৌড়ে পালাতে চাইলাম। ঠিক তখনই—পিঠের দিকে ভারী কিছু আঘাত করল। মনে হলো সীসার মতো ভারী কোনো বস্তু শরীরে গেঁথে গেল।

আমি পুকুর পাড়ে লুটিয়ে পড়লাম। ডান হাত-পা মুহূর্তেই অবশ হয়ে গেল। চোখের সামনে তখন ভেসে উঠল আমার এক বছরের ছোট্ট শিশুটি আর মেয়ে মিম আক্তারের মুখ। ভাবছিলাম, আমি মারা গেলে ওদের কী হবে? আমি কালেমা পড়তে পড়তে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলাম।

৫. জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে

পাশের এক নারীর সাহা্য্যে হামাগুড়ি দিয়ে সরু গলিতে ঢুকলাম। সেখানে আমার অফিসের সহকর্মী হাসনাত ভাইকে পেলাম। তিনিই আমাকে পরম মমতায় উদ্ধার করলেন। রাস্তার পাশে এক ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টা করা হলো, কিন্তু গুলি শরীরের গভীরে থাকায় তা বের করা সম্ভব হলো না।

প্রথমে মৌচাক হাসপাতাল, পরে কোনাবাড়ি হাসপাতাল। শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা আর আগুনের মতো জ্বালাপোড়া নিয়ে আমি তখন কেবল বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। স্ত্রীকে ফোনে বলেছিলাম, "আমাকে গুলি করা হয়েছে, আমি হয়তো বাঁচব না।"

৬. বর্তমান অবস্থা: শরীরে সীসা নিয়েই বেঁচে থাকা

পরবর্তীতে টাঙ্গাইলের কুমুদিনী হাসপাতাল এবং ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিই। ডাক্তাররা জানান, গুলিটি সীসার হওয়ায় এবং শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় থাকায় অপারেশন করে বের করা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শরীরের ভেতর সেই গুলি নিয়েই আমাকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।

এখনো মাঝে মাঝে ব্যথা হয়, শরীর ভারী লাগে। ১৪ দিনের মেডিকেল ছুটি শেষে আবার কর্মস্থলে ফিরেছি। জীবন থেমে থাকে না। তবে ৫ আগস্টের সেই স্মৃতি এবং শরীরের ভেতরে বয়ে বেড়ানো ক্ষত আমাকে প্রতিনিয়ত সেই ভয়াবহ দিনটির কথা মনে করিয়ে দেয়।

আল্লাহ আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। দেশের এই পরিবর্তনে আমার রক্তও মিশে আছে—একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এটাই আমার গর্ব।

By Anwarul is a digital awareness platform focused on ethical living, Islamic values, and meaningful education for Bangla-speaking people. Our goal is to inspire positive thinking, responsible behavi…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন